সহীহ বুখারী, পঞ্চম খন্ড, অধ্যায়-৪৬, শর্তাবলী।


পোস্ট করা হয়েছে:- এপ্রি ১৩ ২০১৭| পোস্টটি করেছেন:- |পোস্টটি পড়া হয়েছে:- 254বার
পোস্টটি শেয়ার করুণ

২৫৩০। ইয়াহইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) … মারওয়ান ও মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ থেকে বর্ণনা করেন, সেদিন (সুলহে হুদায়বিয়র দিন) সুহাইল ইবনু আমর যখন সন্ধিপত্র লিখলেন তখন সুহাইল ইবনু আমার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি এরূপ শর্ত আরোপ করল যে, আমাদের কেউ আপনার কাছে আসলে সে আপনার দ্বীন গ্রহন করা সত্ত্বেও আপনি তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন। আর আমাদের ও তার মাঝে হস্তক্ষেপ করবেন না। মুমিনরা এটা অপছন্দ করলেন এবং এতে ক্রুদ্ধ হলেন। সুহাইল এটা ছাড়া সন্ধি করতে অস্বীকার করল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে শর্ত মেনেই সন্ধিপত্র লেখালেন। সেদিন তিনি আবূ জানদাল (রাঃ) কে তার পিতা সুহাইল ইবনু আমরের কাছে ফেরত দিলেন এবং সে চুক্তি মেয়াদের কালে পুরুষদের মধ্যে যেই এসেছিল মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাকে ফেরত দিলেন।

মুমিন মহিলাগণও হিজরত করে আসলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা ইবনু আবূ মুয়ায়ত (রাঃ) ছিলেন। তিনি ছিলেন যুবতী। তাঁর পরিজন তাদের নিকট একা তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দাবী জানালো। কিন্তু তাকে তিনি তাদের কাছে ফেরত দিলেন না। কেননা, সেই মহিলাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আয়াত নাযিল করেছিলেনঃ মুমিন মহিলাগণ হিজরত করে তোমাদের কাছে আসলে তাদের তোমরা পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিন হবে তাদেরকে কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠাবে না (৬০ঃ ১০)।

উরওয়া (রাঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) আমাদের কাছে বর্ণণা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ‏إِذَا جَاءَكُمْ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ এই আয়াতের ভিত্তিতেই তাদের পরীক্ষা করে দেখতেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, তাদের মধ্যে যারা এই শর্তে সম্মত হতো তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এ কথা বলতেন, ‘আমি তোমাকে বায়আত করলাম। আল্লাহর কসম! বায়আত গ্রহণে তারা কখনো কোন মহিলার হাত স্পর্শ করেনি। তিনি তাদের শুধু (মুখের) কথার মাধ্যমে বায়আত করেছেন।

২৫৩১। আবূ নুআইম (রহঃ) … যিয়াদ ইবনু ইলাকা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জারীর (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বায়আত গ্রহন করলাম। তিনি আমাকে প্রত্যেক মুসলিমের প্রতি কল্যাণ কামনার শর্ত আরোপ করলেন।

২৫৩২। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … জারীর ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বায়আত গ্রহণ করেছি, সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করার, যাকাত প্রদান করার এবং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করার ব্যাপারে।

২৫৩৩। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, কেউ তাবীর করার পর খেজুর গাছ বিক্রি করলে বিক্রেতা তার ফল পাবে, অবশ্য ক্রেতা শর্তারোপ করলে ভিন্ন কথা অর্থাৎ সে পাবে।

২৫৩৪। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারীরা (রাঃ) একবার তাঁর কাছে এসে তার চুক্তি পত্রের (অর্থ আদায়ের) ব্যাপারে সাহায্য প্রার্থনা করল, তখন পর্যন্ত সে চুক্তির অর্থ কিছুই আদায় করেনি। আয়িশা (রাঃ) তাকে বললেন, ‘তুমি তোমার মালিকের কাছে ফিরে যাও। তারা যদি ইহা পছন্দ করে যে, আমি তোমার পক্ষ থেকে তোমার চুক্তিপত্রের প্রাপ্য পরিশোধ করে দিব, আর তোমার ওয়ালা আমার জন্য থাকবে, তাহলে আমি তাই করব।’ বারীরা (রাঃ) তার মালিককে সে কথা জানালে তারা অস্বীকার করল এবং বলল, তিনি যদি তোমাকে দিয়ে সাওয়াব হাসিল করতে চান তবে করুন, তোমার ওয়ালা কিন্তু আমাদেরই থাকবে। আয়িশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সে কথা জানালে তিনি তাঁকে বললেন, ‘তুমি তাকে খরীদ কর এবং আযাদ করে দাও। ওয়ালা সে-ই পাবে যে আযাদ করবে।’

২৫৩৫। আবূ নুআইম (রহঃ) … জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি তাঁর এক উটের উপর সওয়ার হয়ে ভ্রমন করছিলেন, সেটি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং উটটিকে (চলার জন্য) আঘাত করে সেটির জন্য দু’আ করলেন। পলে উটটি এত দ্রুত চলতে লাগলো যে, কখনো তেমন দ্রুত চলেনি। তারপর তিনি বললেন, ‘এক উকিয়ার বিনিময়ে এটি আমার কাছে বিক্রি কর।’ আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ‘এটি আমার কাছে এক উকিয়ার বিনিময়ে বিক্রি কর।’ তখন আমি সেটি বিক্রি করলাম। কিন্তু আমার স্বজনের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত সওয়ার হওয়ার অধিকার রেখে দিলাম। তারপর উট নিয়ে আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমাকে এর নগদ মূল্য দিলেন। তারপর আমি চলে গেলাম। তখন আমার পেছনে লোক পাঠালেন। পরে বললেন, ‘তোমার উট নেওয়ার ইচ্ছা আমার ছিলনা। তোমার এ উট তুমি নিয়ে যাও এটি তোমারই মাল।’

শু’বা (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটির পেছনে মদিনা পর্যন্ত আমাকে সওয়ার হতে দিলেন। ইসহাক (রহঃ) জারীর (রহঃ) সূত্রে মুগীরা (রহঃ) থেকে বর্ণণা করেন, আমি সেটি এ শর্তে বিক্রি করলাম যে, মদিনা পৌঁছা পর্যন্ত তার পিঠে সয়ার অধিকার আমার থাকবে। ‘আতা (রহঃ) প্রমুখ বলেন, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন) মদিনা পর্যন্ত সওয়ার হওয়ার অধিকার তাতে তোমার থাকবে। ইবনু মুনকাদির (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, তিনি মদিনা পর্যন্ত এর পিঠে সওয়ার হওয়ার শর্ত করেছেন। যায়দ ইবনু আসলাম (রাঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, তোমার প্রত্যাবর্তন করা পর্যন্ত এর পিঠে সওয়ার হতে পারবে। আবূ যুবাইর (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তোমাকে মদিনা পর্যন্ত এর পিঠে সওয়ার হতে দিলাম। আমাশ (রহঃ) সলিম (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, এর উপর সওয়ার হয়ে তুমি পরিজনের কাছে পৌঁছবে। উবাইদুল্লাহ ও ইবনু ইসহাক (রহঃ) ওয়াহাব (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক উকিয়ার বিনিময়ে সেটি খরীদ করেছিলেন।

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করতে গিয়ে যায়দ ইবনু আসলাম (রহঃ) ওয়াহাব (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। ইবনু জুরাইজ (রহঃ) আতা (রহঃ) প্রমুখ সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন) আমি এটাকে বার দিনারের বিনিময়ে নিলাম। দশ দিরহামে এক দিনার হিসাবে তাতে এক উকিয়াই হয়। মুগীরা (রহঃ) শাবী (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে এবং ইবনু মুনকাদির আবূ যুবাইর (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণায় মূল্য উল্লেখ করেন নি।

আমশ (রহঃ) সলিম (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনায় এক উকিয়া স্বর্ণ উল্লেখ করেছেন। সালিম (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে আবূ ইসহাকের বর্ণনায় রয়েছে দু’শ দিরহার বিনিময়ে। উবায়দুল্লাহ ইবনু মিকসাম (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে দাউদ ইবনু কায়স (রহঃ) এর বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি সেটি তাবুকের পথে খরীদ করেন। রাবী বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলেছেন, চার উকিয়ার বিনিময়ে। আবূ নাজরা (রাঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি সেটি বিশ দীনারে করীদ করেছেন। তবে শাবী (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত, এক উকিয়াই অধিক বর্ণিত। আবূ আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, (রিওয়ায়াতে বিভিন্ন রকমের হলেও) শর্ত আরোপ কৃত রিওয়ায়াতেই অধিক সূত্রে বর্ণিত এবং আমার মতে এটাই অধিক সহীহ।

২৫৩৬। আবূল ইয়ামান (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারীগণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন ‘আমাদের ও আমাদের (মুহাজির) ভাইদের মধ্যে খেজুর গাছ ভাগ করে দিন।’ তিনি বললেন, না। তখন তাঁরা বললেন, ‘তোমরা আমাদের শ্রমে সাহায্য করবে আর তোমাদের আমরা ফলের অংশ দিব।’ তারা (মুহাজিরগণ) (রাঃ) বললেন, ‘আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।’

২৫৩৭। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার (এর ভূমি) ইয়াহুদীদেরকে দিলেন এর শর্তে যে, তারা তাতে কাজ করবে এবং তাতে ফসল ফলাবে, তাতে যা উৎপন্ন হবে তারা তার অর্ধেক পাবে।

২৫৩৮। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শর্তাবলীর মধ্যে যা পূরণ করার অধিক দাবী রাখে তা হল সেই শর্ত যার মাধ্যমে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।

২৫৩৯। মালিক ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … রাফি ইবনু খাদীজ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারদের মধ্যো আমরা অধিক শষ্য ক্ষেতের মালিক ছিলাম। তাই আমরা ক্ষেত বর্গা দিতাম। কখনো এ অংশে ফসল হতো, আর ঐ অংশে ফসল হতো না। তখন তা আমাদের করতে নিষেধ করে দেওয়া হল। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে চাষ করতে দিতে নিষেধ করা হয়নি।

২৫৪০। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শহরবাসী গ্রামবাসীর পক্ষ হয়ে বিক্রয় করবে না। আর তোমরা (দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে) দালালী করবে না। কেউ যেন তার ভাইয়ের ক্রয়ের উপরে দাম না বাড়ায় এবং কেউ যেন তার ভাইয়ের (বিয়ের) প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। আর কোন স্ত্রীলোক যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের চেষ্টা না করে, যেন তার পাত্রের অধিকারী হয়ে যায়।

২৫৪১। কুতাইবা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা ও যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, আমার ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফয়সালা করুন।’ তখন তার প্রতিপক্ষ, যে তার তুলনায় সমঝদার সে বলল, ‘হ্যাঁ, আপনিা আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফয়সালা করুন এবং (আমাকে ঘটনাটি খুলে বলার) অনুমতি দিন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘বল’। সে বলল, আমার ছেলে এর কাছে মজুর ছিল। সে তার স্ত্রীর সাথে যিনা করেছে। আমাকে বলা হয়েছে যে, আমার ছেলের উপর রাজম প্রযোজ্য। তখন আমি তাকে (ছেলেকে) একশ’ বকরী এবং একটি বাদীর বিনিময়ে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে এনেছি।

পরে আমি আলিমদের জিজ্ঞাসা করলাম। তাঁরা আমাকে জানালেন যে, আমার ছেলের দন্ড হল একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। আর স্ত্রীর দন্ড রজম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করব।’ বাদীঁ এবং একশ’ বকরী তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে। আর তোমার ছেলের দন্ড একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। হে উনায়স। আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর কাছে যাবে। যদি সে স্বীকার তাহলে তাকে রাজম করবে। (রাবী বলেন) উনায়স (রাঃ) পরদিন সকালে সে স্ত্রীলোকের কাছে গেলেন। সে যিনার অপরাধ স্বীকার করল্ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন এবং তাকে রাজম করা হল।

২৫৪২। খাল্লাদ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুকাতাবা অবস্থায় বারীরা আমার কাছে এসে বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আপনি আমাকে খরীদ করুন। কারণ আমার মালিক আমাকে বিক্রি করে ফেলবে। তারপর আমাকে আযাদ করে দিন। তিনি বললেন, ‘বেশ, বারীরা বলল, ‘ওয়ালার অধিকার মালিকের থাকবে-এ শর্ত না রেখে তারা আমাকে বিক্রি করবে না।’ তিনি বললেন, তবে তোমাকে দিয়ে আমার প্রয়োজন নেই। পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনলেন। কিংবা (রাবীর বর্ণনা) তাঁর কাছে সে সংবাদ পৌছল। তখন তিনি বললেন, বারীরার ব্যাপারে কি? এবং বললেন, তাকে খরীদ কর। তারপর তাকে আযাদ করে দাও। তারা যত ইচ্ছা শর্ত আরোপ করুক। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তারপর আমি তাকে খরীদ করলাম এবং আযাদ করে দিলাম। তার মালিক পক্ষ ওয়ালার শর্ত আরোপ করল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওয়ালা তারই হবে, যে আযাদ করবে। তারা শত শর্তারোপ করলেও।

২৫৪৩। মুহাম্মদ ইবনু আরআরা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে শহরের বাউরে গিয়ে বানিজ্যিক কাফেলা থেকে মাল খরীদ করতে নিষেধ করেছেন। আর বেদুঈনের পক্ষ হয়ে মুহাজিরদের বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। আর কোন স্ত্রীলোক যেন তার বোনের (অপর স্ত্রীলোকের) তালাকের শর্তারোপ না করে আর কোন লোক যেন তার ভাইয়ের দামের উপর দাম না করে এবং নিষেধ করেছেন দালালী করতে, (মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে) এবং স্তন্যে দুধ জমা করতে (ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে)। মুআয ও আবদুস সামাদ (রহঃ) শু‘বা (রহঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় মুহাম্মদ ইবনু আরআরা (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। গুনদার ও আবদুর রহমান (রহঃ) نُهِيَ  বলেছেন এবং আদম (রহঃ) نُهِينَا‏ বলেছেন, আর নাজর ও হাজ্জাজ ইবনু মিনহাল বলেছেন, نَهَى

২৫৪৪। ইবরাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) … উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর রাসূল মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন। তারপর তিনি সম্পূর্ণ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। (এ প্রসঙ্গে খিযর (আলাইহিস সালাম) এর এ উক্তিটি উল্লেখ করেন যা তিনি মূসা (আলাইহিস সালাম) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন), আমি কি বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে ধৈর্য্য ধারণ করে থাকতে পারবে না? মূসা (আলাইহিস সালাম) এর আপত্তি) প্রথমটি ছিল ভুলবশত, দ্বিতীয়টি শর্ত স্বরূপ, তৃতীয়টি ইচ্ছাকৃত। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমার ভুলের কারণে আমার দোষ ধরবেন না এবং আমার ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবেন না। তাঁরা উভয়ে এক বালকের সাক্ষাত পেলেন এবং খিযর (আলাইহিস সালাম) তাকে হত্যা করলেন। তারপর তাঁরা উভয়ে পথ চলতে লাগলেন। কিছু দূর এগিয়ে তাঁরা পথনোম্মুখ একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন। খিযর (আলাইহিস সালাম) প্রাচীরটি সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। ইবনু আববাস (রাঃ) আয়াতের (وراءهم مالك) এর স্থলে أَمَامَهُمْ مَلِكٌ‏ পড়েছেন।

২৫৪৫। ইসমাঈল (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারীরা আমার কাছে এসে বলল, আমি আমার মালিকের সঙ্গে নয় উকিয়ার বিনিময়ে আমাকে আযাদ করার এক চুক্তি করেছি। প্রতি বছর এক উকিয়া করে পরিশোধ করতে হবে। তাই আপনি আমাকে সাহায্য করুন। আয়িশা (রাঃ) বললেন, তারা যদি এ শর্তে রাযী হয় যে, আমি তাদের সমস্ত প্রাপ্য এক সাথে দিয়ে দেই এবং তোমার ওয়ালা আমার জন্য থাকবে, তাহলে আমি তা করব। বারীরা তার মালিকের কাছে গিয়ে তাদের এ কথা বলল; কিন্তু তারা তা অস্বীকার করল। তারপর বরীরা তাদের কাছ থেকে ফিরে আসল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসা ছিলেন। বারীরা বলল, আমি তাদের কাছে প্রস্তাবটি পেশ করেছি, ওয়ালার অধিকার তাদের জন্য না হলে, এতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনলেন এবং আয়িশা (রাঃ)-ও তাকে অবহিত করলেন। তারপর তিনি বললেন, তুমি বারীরাকে নিয়ে নাও এবং তাদের জন্য ওয়ালার অধিকারের শর্ত মেনে নাও। কেননা ওয়ালা অধিকার তো তারই যে আযাদ করবে। আয়িশা (রাঃ) তাই করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা করে বললেন, ‘লোকদের কি হল যে, তারা এমন সব শর্ত আরোপ করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই? আল্লাহর কিতাবের বহির্ভুত যে কোন শর্ত বাতিল, যদিও শত শর্তারোপ করা হয়। আল্লাহর ফয়সালা যথার্থ ও তাঁর শর্ত সুদৃঢ়। ওয়ালা তো তারই যে আযাদ করে।

২৫৪৬। আবূ আহমদ (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন খায়বারবাসীরা আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) এর হাত, পা ভেঙ্গে দিল, তখন উমর (রাঃ) ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের ইয়াহুদীদের সাথে তাদের বিষয় সম্পত্তি সম্পর্কে চুক্তি করেছিলেন এবং বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা যতদিন তোমাদের রাখেন, ততদিন আমরাও তোমাদের রাখব। এমতাবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) তাঁর নিজ সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য খায়বার গমন করলে এক রাতে তাঁর উপর আক্রমন করা হয় এবং তাঁর দুটি হাত পা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। সেখানে ইয়াহুদীরা ছাড়া আর কোন শত্রু নেই। তারাই আমাদের দুশমন। তাদের উপর আমাদের সন্দেহ। অতএব আমি তাদের নির্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উমর (রাঃ) যখন এ ব্যাপারে তাঁর দৃঢ় মত প্রকাশ করলেন, তখন আবূ হুকায়ক গোত্রের এক ব্যাক্তি এসে বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি আমাদের খায়বার থেকে বহিস্কার করবেন? অথচ মুহাম্মদ আমাদেরকে এখানে অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। আর উক্ত সম্পত্তির ব্যাপারে আমাদের সাথে বর্গাচাষের ব্যবস্থা করেন এবং আমাদের এ শর্তে দেন।’

উমর (রাঃ) বলেন, ‘তুমি কি মনে করেছ যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে উক্তি ভুলে গিয়েছি, তোমার কি অবস্থা হবে, যখন তোমাকে খায়বার থেকে বের করে দেয়া হবে এবং তোমার উটগুলো রাতের পর রাত তোমাকে নিয়ে ছুটবে।’ সে বলল, ‘এ উক্তি তো আবূল কাসিম এর পক্ষ থেকে বিদ্রুপ স্বরূপ ছিল।’ উমর (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন! তুমি মিথ্যা বলছ।’ তারপর উমর (রাঃ) তাদের নির্বাসিত করেন এবং তাদের ফসলাদি, মালপত্র, উট, লাগাম রশি ইত্যাদি সামগ্রীর মূল্য দিয়ে দেন।

রিওয়ায়াতটি হাম্মদ ইবনু সালামা (রহঃ) … উমর (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেন।

২৫৪৭। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) … মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ) ও মারওয়ান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তাদের উভয়ের একজনের বর্ণনা অপরজনের বর্ণনার সমর্থন করে তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার সময় বের হলেন। যখন সাহাবীগন রাস্তার এক জায়গায় এসে পৌঁছলেন, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘খালিদ ইবনু ওয়ালিদ কুরাইশদের অশ্বারোহী অগ্রগামী বাহিনী নিয়ে গোমায়ম নামক স্থানে অবস্থান করছে। তোমরা ডান দিকে চল’ আল্লাহর কসম! খালিদ মুসলমানদের উপস্থিতি টেরও পেলো না, এমনকি যখন তারা মুসলিম সেনাবাহিনীর পশ্চাতে ধূলিরাশি দেখতে পেল, তখন সে কুরাইশদের সংবাদ দেওয়ার জন্য ঘোড়া দৌড়িয়ে চলে গেল।

এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রসর হয়ে যখন সেই গিরিপথে পৌঁছলেন, যেখান থেকে মক্কার সোজা পথ চলে গিয়েছে, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উটনী বসে পড়ল। লোকজন তাকে (উঠাবার জন্য) ‘হাল-হাল’ বলল, কাসওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কাসওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কাসওয়া ক্লান্ত হয়নি এবং তা তার স্বভাবও নয় বরং তাকে তিনই আটকিয়েছেন যিনি হাতি বাহিনীকে আটকিয়েছিলেন।’ তারপর তিনি বললেন, ‘সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ‘ কুরাইশরা আল্লাহর সম্মানিত বিষয় সমূহের মধ্যে যে কোন বিষয়ের সম্মান প্রদর্শনার্থে কিছু চাইলে আমি তা পূরণ করব।’

এরপর তিনি তাঁর উষ্ট্রীকে ধমক দিলে সে উঠে দাঁড়াল। রাবী বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পথ ত্যাগ করে হুদায়বিয়ার শেষ প্রান্তে অল্প পানি বিশিষ্ট কূপের কাছে অবতরণ করেন। লোকজন তা থেকে অল্প-অল্প পানি নিচ্ছিল। এভাবে কিছুক্ষনের মধ্যেই লোকজন পানি শেষ করে ফেলল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পিপাসার অভিযোগ করা হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোষ থেকে একটি তীর বের করলেন এবং সেই তীরটি সেই কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর কসম! তখন পানি উপচে উঠতে লাগল, এমনকি সকলেই তৃপ্তি সহকারে পানি পান করলেন।

এমন সময় বুদায়ল ইবনু ওয়ারকা খুযাঈ তার খুযাআ গোত্রের কিছু লোক নিয়ে এলো। তারা তিহামাবাসীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আন্তরিক হিতাকাঙ্খি ছিল। বুদাইল বলল, আমি কাব ইবনু লুওহাই ও আমির ইবনু লুওহাইকে রেখে এসেছি। তারা হুদায়বিয়ার প্রচুর পানির নিকট অবস্থান করছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে সাবকসহ দুগ্ধবতী অনেক উষ্ট্রী। তারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও বায়তুল্লাহ যিয়ারতে বাধা প্রদান করতে প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি তো কারো সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসিনি; বরং উমরা করতে এসেছি। যুদ্ধ নিঃসন্দেহে কুরাইশদের দূর্বল করে ফেলেছে, ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা যদি চায়, তবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের সঙ্গে সন্ধি করতে পারি আর তারা আমার ও কাফিরদের মধ্যকার বাধা তুলে নিবে।

যদি আমি তাদের উপর জয়ী হয় তবে অন্যান্য লোক ইসলামে যেভাবে প্রবেশ করেছে, তারাও চাইলে তা করতে পারবে। আর না হয়, তারা এসময়টুকুতে শান্তিতে থাকবে। কিন্তু তারা যদি আমার প্রস্তাব অস্বীকার করে, তা হলে সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার গর্দান বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাব। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ বুদায়ল বলল, ‘আমি আপনার বক্তব্য তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিব।

এরপর বুদায়ল কুরাইশদের কাছে এসে বলল, ‘তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে তোমার কিছু বলার প্রয়োজন মনে করি না। কিন্তু তাদের বিবেকবান লোকেরা বলল, ‘তুমি তাঁকে যা বলতে শুনেছ, আমাদেরকে তা বল।’ তারপর বুদায়ল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছিলেন, সব তাদের শোনাল। তারপর উরওয়া ইবনু মাসউদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে লোকেরা! আমি কি তোমাদের পিতৃতুল্য নই? তারা বলল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। ’ উরওয়া বলল, ‘তোমরা কি আমার সন্তান তুল্য নও?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই। ’ উরওয়া বলল, আমার সম্বন্ধে তোমাদের কি কোন অভিয়োগ আছে? তারা বলল, না। উরওয়া বলল, তোমরা কি জানো না যে, আমি তোমদের সাহায্যের জন্য উকাযবাসীদের কাছে আবেদন করেছিলাম এবং তারা আমাদের আহবানে সাড়া দিতে অস্বীকার করলে আমি আমার আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্তুতি ও আমার অনুগতদের নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছিলাম? তারা বলল, হ্যাঁ, জানি।

উরওয়া বলল, এই লোকটি তোমাদের কাছে একটি ভাল প্রস্তাব পেশ করেছেন। তোমরা তা মেনে নাও এবং আমাকে তাঁর কাছে যেতে দাও। তারা বলল, আপনি তাঁর কাছে যান। তারপর উরওয়া নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এল এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সঙ্গে কথা বললেন, যেমনিভাবে বুদায়লের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। উরওয়া তখন বলল, হে মুহাম্মদ, আপনি কি চান যে, আপনার কওমকে নিশ্চিহৃ করে দিবেন, আপনি আপনার পূর্বের আরববাসীদের এমন কারো কথা শুনেছেন যে, সে নিজ কওমের মুলোৎপাটন করতে উদ্যত হয়েছিল? আর যদি অন্য রকম হয়, (তখন আপনার কি অবস্থা হবে?) আল্লাহর কসম! আমি কিছু চেহারা দেখছি এবং বিভিন্ন ধরণের লোক দেখতে পাচ্ছি যাঁরা পালিয়ে যাবে এবং আপনাকে পরিত্যাগ করবে।

তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি লাত দেবীর লজ্জাস্থান চেটে খাও। আমরা কি তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাব? উরওয়া বলল, সে কে? লোকজন বললেন, আবূ বকর। উরওয়া বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর কসম করে বলছি, আমার উপর যদি আপনার ইহসান না থাকত, যার প্রতিদান আমি দিতে পারিনি, তাহলে নিশ্চই আপনার কথার জবাব দিতাম। রাবী বললেন, উরওয়া পুনরায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়িতে হাত দিত। তখন মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তাঁর সাথে ছির একটি তরবারী ও মাথায় ছিল লৌহ শিরস্ত্রা। উরওয়া যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ির দিকে তার হাত বাড়াতো মুগীরা (রাঃ) তাঁর তরবারীর হাতল দিয়ে তার হাতে আঘাত করতেন এবং বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ি থেকে তোমার হাত হটাও।

উরওয়া মাথা তুলে বলল, এ কে? লোকজন বললেন, মুগীরা ইবনু শুবা। উরওয়া বলল, হে গাদ্দার! আমি কি তোমার গাদ্দারীর পরিণতি থেকে তোমাকে উদ্ধারের চেষ্টা করিনি? মুগীরা (রাঃ) জাহেলী যুগে কিছু লোকদের সাথে ছিলেন। একদিন তাদের হত্যা করে তাদের সহায় সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমার ইসলাম মেনে নিলাম, কিন্তু যে মাল তুমি নিয়েছ, তার সাথে আমার কোন সর্ম্পক নেই। তারপর উরওয়া চোখের কোন দিয়ে সাহাবীদের দিকে তাকাতে লাগল। সে বলল, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো থুথু ফেললে তা সাহাবীদের হাতে পড়তো এবং তা গায়ে মুখে মেখে ফেলতেন। তিনি তাঁদের কোন আদেশ দিলে তা তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পালন করতেন। তিনি উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলে তাঁর উযূ (ওজু/অজু/অযু)র পানির জন্য তাঁর সাহাবীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হতো। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন নিরবে তা শুনতেন এবং তাঁর সম্মানার্থে সাহাবীগন তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেন না।

তারপর উরওয়া তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেল এবং বলল, হে আমার কওম, আল্লাহর কসম! আমি অনেক রাজা বাদশাহর নিকটে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কায়সার (রোম) কিসরা (পারস্য) ও নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার) সম্রাটের নিকটে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আমি আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোন রাজা বাদশাহকেই তার অনুসরীদের ন্যায় এত সম্মান করতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মদের অনুসারীরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি থুথু ফেলেন, তখন তা কোন সাহাবীর হাতে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা তা তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলেন। তিনি কোন আদেশ দিলে তারা তা সঙ্গে সঙ্গে পালন করেন; তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানি নিয়ে সাহাবীগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়; তিনি কথা বললে, সাহাবীগণ নিশ্চুপ হয়ে শুনেন। এমনকি তাঁর সমামানার্থে তারা তাঁর চেহারার দিকেও তাকান না। তিনি তোমাদের কাছে একটি ভালো প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, তোমরা তা মেনে নাও।

তা শুনে কিনানা গোত্রের এক ব্যাক্তি বলল, আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও। লোকেরা বলল, যাও। সে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের কাছে এল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ হল অমুক ব্যাক্তি এবং এমন গোত্রের লোক, যারা কুরবানীর পশুকে সম্মান করে থাকে। তোমরা তার কাছে কুরবাণীর পশু নিয়ে আস। তারপর তার কাছে তা নিয়ে আসা হল এবং লোকজন তালবিয়া পাঠ করতে করতে তার সামনে এলেন। তা দেখে লোকটি বলল, সুবাহান্নাল্লাহ! এমন সব লোকদেরকে কাবা যিয়ারত থেকে বাধা দেওয়া সঙ্গত নয়। তারপর সে তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, আমি কুরবাণরি পশু দেখে এসেছি, সেগুলোকে কিলাদা পরানো হয়েছে ও চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই তাদের কাবা যিয়ারত বাধা প্রদান সঙ্গত মনে করি না।

তখন তাদের মধ্যে থেকে মিকরায ইবনু হাকস নামক এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আমাকে তাঁর কাছে যেতে দাও। তারা বলল, তাঁর কাছে যাও। তারপর সে যখন মুসলিমদের নিকটবর্তী হল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সহজ হয়ে গেল।’ মা’মার (রহঃ) বলেন, যুহরী (রহঃ) তার বর্ণিত হাদীসে বলেছেন যে, সুহায়ল ইবনু আমর এসে বলল, আসুন আমাদের অ আপনাদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র লিখি। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন লেখককে ডাকলেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (লিখ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এতে সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! রাহমান কে? আমরা তা জানি না, বরং পূর্বে আপনি যেমন লিখতেন, লিখুন بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ‏

মুসলিমগন বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ‏ ছাড়া আর কিছু লিখব না। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লিখ, بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ তারপর বললেন, এটা যার উপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলেই বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনাকে কাবা যিয়ারত দেখে বাধা দিতাম না এবং আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উদ্যত হতাম না। বরং আপনি লিখুন, আবদুল্লাহ পুত্র মুহাম্মদ (এর তরফ থেকে)। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘নিশ্চুই আমি আল্লাহর রাসূল কিন্তু তোমরা যদি আমাকে অস্বীকার কর তবে লিখ, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।’

যুহরী (রহঃ) বলেন, এটি এ জন্য যে, তিনি বলেছিলেন, তারা যদি আল্লাহর পবিত্র বস্তুগুলোর সম্মান করার কোন কথা দাবী করে তাহলে আমি তাদের সে দাবী মেনে নিব। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ চুক্তি কর যে, তারা আমাদের ও কাবা শরীফের মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে না, যাতে আমরা (নির্বিঘ্নে) তাওয়াফ করতে পারি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আরববাসীরা যেন এ কথা বলার সুযোগ না পায় যে, এ প্রস্তাব গ্রহণে আমাদের বাধ্য করা হয়েছে। বরং আগামী বছর তা হতে পারে। তারপর লেখা হল। সুহায়ল বলল, এ-ও লিখা হোক যে, আমাদের কোন লোক যদি আপনার কাছে চলে আসে এবং সে যদিও আপনার দ্বীন গ্রহণ করে থাকে, তবুও তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন। মুসলিমগণ বললেন, সুবাহান্নাল্লাহ! যে ইসলাম গ্রহন করে আমাদের কাছে এসেছে, তাকে কেমন করে মুশরিকদের কাছে ফেরত দেওয়া যেতে পারে?

এমন সময় আবূ জানদাল ইবনু সুহায়ল ইবনু আমর সেখানে এসে উপস্থি হলেন। তিনি বেড়ী পরিহিত অবস্থায় ধীরে ধীরে চলছিলেন। তিনি মক্কার নিম্নাঞ্চল থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমদের সামনে নিজেকে পেশ করলেন। সুহায়ল বলল, হে মুহাম্মদ! আপনার সাথে আমার চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী প্রথম কাজ হল তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখনো তো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! তাহলে আমি আপনাদের সঙ্গে আর কখনো সন্ধি করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেবল এ লোকটিকে আমার কাছে থাকার অনুমতি দাও। সে বলল, না। এ অনুমতি আমি দেবো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি এটা কর। সে বলল, আমি তা করব না।

মিকরায বলল, আমরা তাকে আপনার কাছে থাকার অনুমতি দিলাম। আবূ জানদাল বলেন, হে মুসলিম সমাজ, আমাকে মুশরিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, অথচ আমি মুসলিম হয়ে এসেছি। আপনার কি দেখছেন না, আমি কত কষ্ট পাচ্ছি। আল্লাহর রাস্তায় তাকে অনেক নির্যাতিত করা হয়েছে। উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহর সত্য নাবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, আমরা কি হকের উপর নই আর আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা হেয় হবো?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললাম, ‘আমি অবশ্যই রাসূল অতএব আমি তার অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনই আমার সাহায্যকারী। আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেন নাই যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কাবা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। উমর (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললাম, হে আবূ বকর। তিনি কি আল্লাহর সত্য নাবী নন? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, আমরা কি সত্যের উপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নয়? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, নিশ্চই। আমি বললাম, তবে কেন আমরা এখন আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব?

আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘ওহে’ নিশ্চই তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর অনুসরণকে আকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের উপর আছেন। আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ যাব এবং তার তাওয়াফ করব। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে তিনি এ কথা কি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, তবে নিশ্চই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।

যুহরী (রহঃ) বলেন যে, উমর (রাঃ) বলেছিলেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফফারা হিসাবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বললেন, তোমরা উঠ এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল। রাবী বলেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা তিনবার বলার পরও কেউ উঠলেন না। তাদের কাউকে উঠতে না দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা (রাঃ)-এর কাছে এসে লোকদের এ আচরণের কথা বলেন। উম্মে সালামা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নাবী! আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সাথে কোন কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।

সেই অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন এবং কারো সাথে কোন কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিলেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হল যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের উপর পড়তে লাগলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কয়েকজন মুসলিম মহিলা এলেন। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেনঃ ‏يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ হে মুমিনগণ! মুমিন মহিলারা তোমাদের কাছে হিযরত করে আসলে, …… কাফির নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। (৬ঃ ১০)

সেদিন উমর (রাঃ) দু’জন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন, তারা ছিলেন মুশরিক থাকাকালে তার স্ত্রী। তাদের একজনকে মুআবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়অন এবং অপরজনকে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া বিয়ে করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ফিরে আসলেন। তখন আবূ বাসীর (রাঃ) নামক কুরাইশ গোত্রের এক ব্যাক্তি ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। মক্কার কুরাইশরা তাঁর তালাশে দু‘জন লোক পাঠাল। তারা (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে) বলল, আপনি আমাদের সাথে যে চুক্তি করেছেন (তা পূর্ণ করুন)। তিনি তাকে ঐ দুই ব্যাক্তির হাওয়ালা করে দিলেন। তাঁরা তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল এবং যুল-হুলায়ফায় পৌছে অবতরণ করল আর তাদের সাথে যে খেজুর ছিল তা খেতে লাগল।

আবূ বাসীর (রাঃ) তাদের একজনকে বললেন, আল্লাহর কসম! হে অমুক, তোমার তরবারীটি খুবই চমৎকার দেখছি। সে লোকটি তরবারীটি বের করে বলল, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এটি একটি উৎকৃষ্ট তরবারী। আমি একাধিক বার তা পরীক্ষা করেছি। আবূ বাসীর (রাঃ) বললেন, তলোয়ারটি আমি দেখতে চাই তা আমাকে দেখাও। তারপর লোকটি আবূ বাসীরকে তলোয়ারটি দিল। আবূ বাসীর সেটি দ্বারা তাকে এমন আঘাত করলেন যে, তাতে সে মরে গেল। তার অপর সঙ্গী পালিয়ে মদিনায় এসে পৌছল এবং দাঁড়িয়ে মসজিদে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে বললেন, এই লোকটি ভীতিজনক কিছু দেখে এসেছে।

ইতিমধ্যে লোকটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌছে বলল, আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে, আমিও নিহত হতাম। এমন সময় আবূ বাসীর (রাঃ)-ও সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, ইয়া নাবীয়াল্লাহ! আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন। আমাকে তার কাছে ফেরত দিয়েছেন; এ ব্যাপা আল্লাহ আমাকে তাদের কবল থেকে নাজাত দিয়েছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সর্বনাশ! এতো যুদ্ধের আগুন প্রজ্জলিতকারী, কেউ যদি তাকে বিরত রাখত। আবূ বাসীর (রাঃ) যখন এ কথা শুনলেন, তখন বুঝতে পারলেন যে, তাকে তিনি আবার কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠাবেন। তাই তিনি বেরিয়ে নদীর তীরে এসে পড়লেন।

রাবী বলেন, এ দিকে আবূ জানদাল ইবনু সুহায়ল কাফিরদের কবল থেকে পালিয়ে এসে আবূ বাসীরের সঙ্গে মিলিত হলেন। এরপর থেকে কুরাইশ গোত্রের যে-ই ইসলাম গ্রহণ করত, সে-ই আবূ বাসীরের সঙ্গে এসে মিলিত হতো। এভাবে তাদের একটি দল হয়ে গেল। আল্লাহর কসম! তারা যখনই শুনতেন যে, কুরাইশদের কোন বানিজ্য কাফিলা সিরিয়া যাবে, তখনই তারা তাদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন আর তাদের হত্যা করতেন ও তাদের মাল সামান কেড়ে নিতেন্ তখন কুরাইশরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে লোক পাঠাল। আল্লাহ ও আত্মীয়তার ওয়াসীলা দিয়ে আবেদন করল যে, আপনি আবূ বাসীরের কাছে এর থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ পাঠান। এখন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে) কেউ এলে সে নিরাপদ থাকবে (কুরাইশদের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে না)।

তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে নির্দেশ পাঠালেন। এ সময় আল্লাহ তাআলা নাযিল করেনঃ وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ مِنْ بَعْدِ أَنْ أَظْفَرَكُمْ عَلَيْهِمْ থেকে ‏الْحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ পর্যন্ত। অর্থঃ তিনি তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে বিরত রেখেছেন …… জাহেলী যুগের অহমিকা পর্যন্ত ৪৮ঃ ২৬। তাদের অহমিকা এই ছিল যে, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহর নাবী বলে স্বীকার করেনি এবং মেনে নেইনি; বায়তুল্লাহ ও মুসলিমদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।

উকাইল (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, উরওয়া (রহঃ) বলেন যে, আমার কাছে আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম মহিলাদের পরীক্ষা করতেন এবং আমাদের কাছে এ বর্ণনা পৌছেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন, মুসলমানগণ যেন মুশরিক স্বামীদের সে সব খরচ আদায় করে দেয়, যা তারা তাদের হিযরতকারী স্ত্রীদের জন্য ব্যয় করেছে এবং মুসলিমদের নির্দেশ দেন যেন তারা কাফির স্ত্রীদের আটকিয়ে না রাখে। তখন উমর (রাঃ) তাঁর দুই স্ত্রী কুরায়বা বিনতে আবূ উমায়্যা ও বিনতে জারওয়াল খুযায়ীকে তালাক দিয়ে দেন। এরপর কুরায়বাকে মুআবিয়া ও অপর জনকে আবূ জাহাম বিয়ে করে নেয়। তারপর কাফিররা যখন মুসলমানদের তাদের স্ত্রীদের জন্য খরচকৃত অর্থ ফেরত দিতে অস্বীকার করল, তখন নাযিল হলঃ وَإِنْ فَاتَكُمْ شَىْءٌ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ إِلَى الْكُفَّارِ فَعَاقَبْتُمْ‏ তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেউ হাত ছাড়া হয়ে কাফিরদের কাছে চলে যায়, তবে তার বদলা নিবে। ৬০ঃ ১১ বদলা হলঃ কাফিরদের স্ত্রী যারা হিযরত করে চলোসে, তাদের কাফির স্বামীকে মাহর মুসলিমদের যা দিতে হয়, এ সমন্ধে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দেন যে, তারা যেন মুসলিমদের যে সব স্ত্রী চলে গেছে ঐ অর্থ তাদের স্বামীদেরকে দিয়ে দেয়।

(যুহরী (রহঃ) আরো বলেন) এমন কোন মুহাজির রমনীর কথা আমাদের জানা নেই, যে ঈমান আনার পর মুরতাদ হয়ে চলে গেছে। আমাদের কাছে এ বর্ণণা পৌছেছে যে, আবূ বাসীর ইবনু আসীদ সাকাফী (রাঃ) ঈমান এনে চুক্তির মিয়াদের মধ্যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হিজরত করে চলে আসলেন। তখন আখনাস ইবনু শারীক আবূ বাসীর (রাঃ) কে ফেরত চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পত্র লিখল। তারপর তিনি হাদীসের অবশিষ্ট অংশ বর্ণনা করেছেন।

২৫৪৮। আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারীরা তার কিতাবতের ব্যাপারে তাঁর কাছে সাহায্যের আবেদন নিয়ে এল। তিনি বললেন, তুমি চাইলে আমি (কিতাবতের সমুদয় প্রাপ্য) তোমার মালিককে দিয়ে দিতে পারি এবং ওয়ালার অধিকার হবে আমার। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন, তিনি তাঁর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাকে কিনে আযাদ করে দাও। কেননা, ওয়ালার অধিকার তারই, যে আযাদ করে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘লোকদের কি হয়েছে যে, তারা এমন সব শর্ত আরোপ করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই! যে এমন শর্ত আরোপ করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই, সে তার অধিকারী হবে না যদিও শত শর্ত আরোপ করে।’

২৫৪৯। আবূল ইয়ামান (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিরান্নববই অর্থাৎ এক কম একশটি নাম রয়েছে, যে ব্যাক্তি তা স্মরণ রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

২৫৫০। কুতাইবা ইবনু সাইদ (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) খায়বারে কিছু জমি লাভ করেন। তিনি এ জমির ব্যাপারে পরামর্শের জন্য রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন এবং বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি খায়বারে এমন উৎকৃষ্ট কিছু জমি লাভ করেছি যা ইতিপূর্বে আর কখনো পাইনি। আপনি আমাকে এ ব্যাপারে কি আদেশ দেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি ইচ্ছা করলে জমির মূলসত্ত্ব ওয়াকফে আবদ্ধ করতে এবং উৎপন্ন বস্তু সাদকা করতে পার।’ ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, ‘উমর (রাঃ) এ শর্তে তা সাদকা (ওয়াকফ) করেন যে, তা বিক্রি করা যাবে না, তা দান করা যবে না এবং কেউ এর উত্তরাধীকারী হবে না। তিনি সাদকা করে দেন এর উৎপন্ন বস্তু অভাবগ্রস্ত, আত্মীয়-স্বজন, দাসমুক্তি, আল্লাহর রাস্তায়, মূসাফির মেহমানদের জন্য। (রাবী আরো বলেন) যে এর মুতাওয়াল্লী হবে তার জন্য সম্পদ সঞ্চয় না করে যথাবিহীত খওয়ানোতে কোন দোষ নেই। তারপর আমি ইবনু সীরিন (রহঃ) এর নিকট হাদীসটি বর্ণনা করলে তিনি বলেন, অর্থাৎ মাল জমা না করে।

 

পোস্টটি শেয়ার করুণ

সর্বশেষ আপডেট: এপ্রিল ১৩th, ২০১৭ সময়: ৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ, আপডেট করেছেন মুনজুরুল আলম (এডমিন)


লেখক পরিচিতিঃ- মুনজুরুল আলম (এডমিন)

আসসালামু আলাইকুম। আমি মুনজুরুল আলম। বর্তমানে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি। আমি ছোট বেলা থেকে লেখলেখি করায় মজা পাই। আমি মনে করি জানার কোন শেষ নেই। আমি সবার কাছ থেকে শিখতে পছন্দ করি। আর আমার শেখা তখনই স্বার্থক হবে যখন তা অন্যের কাছে পৌছে দিতে পারব।আর আমি চাই সবাইকে আমার ওয়েবসাইটে মেধা বিকাশের সুগোয দিতে। তাই আপনিও পারেন আমাদের ওয়েব সাইটের একজন লেখক হতে। তাহলে আজই রেজিস্ট্রেশন করুন ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.